মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাবে অস্থির হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্যবাজার। এই আন্তর্জাতিক সংকটের ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে—বাড়তি ভর্তুকির বিপুল চাহিদা। বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, ডলারের অবমূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার কারণে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কৃষি খাতে ভর্তুকির বোঝা এখন ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে। বিভিন্ন সূত্রে থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ভর্তুকির চাহিদা বৃদ্ধির পেছনে মূলত চারটি প্রধান কারণ কাজ করছে:(১)যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকট: মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বিশ্ববাজারে এলএনজি, ফার্নেস অয়েল ও কয়লার দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে।(২)ডলার সংকট ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন: ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানি খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে জ্বালানি কেনায়।(৩)কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: বিশ্ববাজারে সারের দাম বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্য ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ও বড় অংকের ভর্তুকি দাবি করেছে।(৪) বিদ্যুৎ খাতের অদক্ষতা: সিপিডি-র মতো গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, কেবল বৈশ্বিক সংকট নয়, বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং অদক্ষতাই এই খাতকে চরম ভর্তুকিনির্ভর করে তুলেছে। আগামী অর্থবছরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে অর্থবিভাগে আসা প্রস্তাবনাগুলো পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অর্থের সিংহভাগই যাবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের পকেটে:বিদ্যুৎ খাত ভর্তুকি ৫৯,১৪৫(কোটি টাক)জ্বালানি (গ্যাস ও তেল) ৫০,০০০ (প্রাক্কলিত) কৃষি ও খাদ্য ৩০,০০০ মোট ১,৩৯,১৪৫ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগ ও পেট্রোবাংলার প্রাথমিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে এই অংকটি ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের আকাশচুম্বী চাহিদা অনুসারে, বিদ্যুৎ বিভাগ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আইপিপি) ও ভারতের আদানি পাওয়ারের বকেয়া পরিশোধেই একটি বড় অংশ ব্যয় হবে। এছাড়া, জুলাই থেকে ডিসেম্বর—এই ছয় মাসের জন্য গ্যাস খাতে পেট্রোবাংলা ২৭ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পুরো অর্থবছরে গ্যাস খাতের ভর্তুকি ৫০ হাজার কোটি টাকা স্পর্শ করতে পারে। সরকার গত মাসে বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি ১৬.৬৮ শতাংশ বাড়ালেও, বিশেষজ্ঞেরা বলছেন এটি যৎসামান্য। যদিও সরকার আশা করছে এতে ১৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি সাশ্রয় হবে, কিন্তু জ্বালানি তেলের বর্তমান উচ্চমূল্যে সেই সাশ্রয় কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ভর্তুকির এই বিশাল অংক বাজেট ব্যবস্থাপনাকে কঠিন করে তুলবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন: "কেবল আন্তর্জাতিক সংকটকে দায়ী করলেই হবে না; বিদ্যুৎ খাতের অদক্ষতা ও সুশাসনের অভাবই ভর্তুকি বাড়ার মূল কারণ। এছাড়া, কর-জিডিপি অনুপাত না বাড়লে এই বিশাল ভর্তুকির অর্থ জোগাতে সরকারকে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।" তিনি আরও বলেন, সরকার যদি ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়, তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হবে, যা দেশের সার্বিক শিল্প প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে। অর্থবিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সব মন্ত্রণালয় যে পরিমাণ ভর্তুকি চেয়েছে, পুরোটা বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। তিনি বলেন, "আমরা বর্তমান বাজারের প্রেক্ষিতে একটি যৌক্তিক বরাদ্দ রাখার চেষ্টা করছি। যুদ্ধ পরিস্থিতি শিথিল হলে বা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে এই চাহিদাও কমে আসবে। বাজেট প্রণয়নের সময় অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই অর্থ বরাদ্দ করা হবে।" আগামী বাজেটে সরকার ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ মিলিয়ে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করছে। তবে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে—এই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত কতটা টেকসই হবে, তা এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।