শিরোনামঃ

ইয়াবা চালানের নেপথ্যে বক্তার মেম্বার, মুখ খোলায় রোহিঙ্গা পরিবারকে খুনের হুমকি

মুসলিম উদ্দিন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি: মুসলিম উদ্দিন
ছবি: মুসলিম উদ্দিন

কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্ত ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাদক চোরাচালানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণকারী, বালুখালীর প্রভাবশালী ইউপি সদস্য (মেম্বার) বক্তার আহমদের মাদক সাম্রাজ্যের এক চাঞ্চল্যকর নেপথ্য কাহিনী উন্মোচিত হয়েছে। বক্তার মেম্বারের পাঠানো ২০ হাজার পিস ই-ইয়াবার একটি বড় চালানের মধ্যে ১০ হাজার পিস কৌশলে গায়েব করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যস্থানে পৌঁছে দেওয়া হলেও, বাকি ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ চট্টগ্রামের আনোয়ারায় আটক হয়েছে মোঃ আজিজ (৩৬) ও সুমন (২০) নামে দুই রোহিঙ্গা যুবক। তবে এই চালানের মূল গডফাদার বক্তার মেম্বার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে এখন ভুক্তভোগী পরিবারটিকে মুখ না খুলতে এবং প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

​মামলার বিবরণ ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ০৬ জুন ২০২৬ইং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের একটি চৌকস দল চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারার কালাবিবির দিঘির পাড় সাফওয়ান ফুড অ্যান্ড সুইটস দোকানের সামনে পিএবি সড়কের ওপর বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। তখন সকাল আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে পেকুয়া হতে আসা 'মেসার্স এস আলম সার্ভিস' নামের একটি যাত্রীবাহী বাসে (চট্টগ্রাম-ব-১১-১৭২৫) তল্লাশি চালিয়ে উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৮, ব্লক-সি/৪ এর বাসিন্দা মোঃ আজিজ ও সুমনকে আটক করা হয়। এ সময় আজিজের লুঙ্গির নিচে ডান হাঁটুর উপরে বিশেষভাবে বাঁধা অবস্থায় ২ হাজার পিস এবং সুমনের কাছ থেকে ৮ হাজার পিসসহ মোট ১০হাজার পিস অ্যামফিটামিনযুক্ত ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৩০ লক্ষ টাকা। এই ঘটনার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিদর্শক মোঃ ফাহিম রাজু বাদী হয়ে আনোয়ারা থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করেন।

কারাগারে স্ত্রী ইয়াসমিন ও ভাই মোহাম্মদ আনসার উল্লাহর সাথে সাক্ষাৎকালে আটককৃত মোঃ আজিজ অশ্রুসিক্ত চোখে ঘটনার বর্ণনা দেন। আজিজের বরাতে তার পরিবার জানায়, সে দীর্ঘদিন ধরে বালুখালীর বক্তার মেম্বারের বাসায় দিনমজুর হিসেবে কাজকর্ম করে আসছিল। ঘটনার দিন অর্থাৎ ০৬ জুন সকাল আনুমানিক ৬টার দিকে বক্তার মেম্বার নিজে আজিজের হাতে একটি বড় প্যাকেট তুলে দেন এবং সেটি চট্টগ্রামের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেন। নিরাপদ পাহারার জন্য আজিজ ও সুমন নামের এক রোহিঙ্গা যুবকের সাথে উখিয়ার বালুখালীর এক বিশ্বস্ত সিন্ডিকেট সদস্যকে (মুরব্বি) পাঠান বক্তার মেম্বার। মেম্বার তাদের সাফ জানিয়ে দেন, "তোমাদের সাথে থাকা মুরব্বি যেখানে যাকে এই প্যাকেট বুঝিয়ে দিতে বলবে, তোমরা ঠিক সেখানে তা দিয়ে দিবা।"

​আজিজ জানায়, পরে জানতে পারি প্রকৃতপক্ষে ওই চালানে দুটি প্যাকেটে মোট ২০ হাজার পিস ইয়াবা ছিল। বাসটি যখন চট্টগ্রামের আনোয়ারার কালাবিবির দিঘির পাড় এলাকায় পৌঁছায়, তখন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দল তল্লাশি শুরু করে। প্রশাসনের গাড়ি দেখা মাত্রই বাসের ভেতরে থাকা চতুর "মুরব্বি" কৌশলে ১০ হাজার ইয়াবার একটি প্যাকেট নিজের জিম্মায় নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে চোখের পলকে হাওয়া হয়ে যায়। পরবর্তীতে ওই মুরব্বি নিখুঁতভাবে ১০ হাজার ইয়াবা বক্তার মেম্বারের নির্ধারিত লোকের হাতে পৌঁছে দেয়। আর বাকি ১০ হাজার ইয়াবাসহ বাসের ভেতরেই ফেঁসে যায় কোনো কিছু না জানা সরলসোজা দিনমজুর আজিজ ও সুমন। আজিজ আক্ষেপ করে তার পরিবারকে বলে, "আমি বক্তার মেম্বারের কথায় বিশ্বাস করে এসে আজ বলির পাঁঠা হলাম। মূল অপরাধী বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আমরা খাঁচায় বন্দি।"

স্বামী ও ভাইয়ের আটকের খবর পেয়ে স্ত্রী ইয়াসমিন ও ভাই আনসার উল্লাহ নিরুপায় হয়ে বালুখালীতে বক্তার মেম্বারের বাসভবনে যান। তারা মেম্বারকে বলেন, "আপনার দেওয়া ইয়াবা নিয়ে আমার স্বামী ও ভাই আটক হয়েছে, এখন দয়া করে তাদের জেল থেকে বের করার ব্যবস্থা করুন।"
​এই কথা বলার সাথে সাথেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন গডফাদার বক্তার মেম্বার। তিনি তাদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করেন এবং হুমকি দিয়ে বলেন, "তোর স্বামী কৌশলে প্রশাসনের কাছে আমার ইয়াবা ধরা খাইয়েছে! ও যদি জেল থেকে বের হয় তবে তাকে জ্যান্ত মেরে ফেলা হবে। তোদের এই ক্যাম্পে থাকতে দেওয়া হবে না। যদি বাঁচতে চাস, তবে আমার খোয়া যাওয়া ইয়াবাগুলো এনে দে!" গডফাদারের এমন হুমকিতে বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ভুক্তভোগী পরিবারটি। তারা যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা করছেন।

স্থানীয় সূত্র ও সচেতন মহলের মতে, উখিয়ার বালুখালী সীমান্তের চোরাচালান ও মাদক সিন্ডিকেটের অঘোষিত রাজা এই বক্তার মেম্বার। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রতিনিধির লেবাস গায়ে দিয়ে পর্দার আড়ালে থেকে মিয়ানমার থেকে আসা কোটি কোটি টাকার মাদকের সেফ প্যাসেজ নিয়ন্ত্রণ করছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে তিনি নিজের বাড়ির কর্মচারী এবং ক্যাম্পের অসহায়, নিরীহ রোহিঙ্গাদের চড়া টাকার প্রলোভন দেখিয়ে বা বাধ্য করে 'ক্যারিয়ার' বা বাহক হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। কোনো চালান ধরা পড়লে বাহকরা জেলে গেলেও মূল হোতা বক্তার মেম্বার ও তার সিন্ডিকেট থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

​ভুক্তভোগী পরিবার এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষ এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ উচ্চতর তদন্ত দাবি করেছেন। মামলার আইনি নথির পাশাপাশি নেপথ্যের মূল গডফাদার বক্তার মেম্বারকে অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে এই আন্তর্জাতিক মাদক চক্রকে উপড়ে ফেলার জন্য প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL